কূটনৈতিক সাফল্য থেকে অর্থনৈতিক শক্তিতে উত্তরণের সময় এখন। বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কূটনৈতিক মর্যাদা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে এখন বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে রূপান্তর করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা
চীন: শিল্পাঞ্চল, উৎপাদন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, বন্দর ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলেও চীনা বিনিয়োগের উদ্যোগ এগিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র: বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কৃষি ও শিল্পপণ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ অর্থায়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন EXIM Bank ও DFC-এর মাধ্যমে যোগ্য প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগও রয়েছে।
সৌদি আরব: বন্দর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিনিয়োগ, জনশক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। Bay Terminalসহ বন্দর খাতে বড় বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
তুরস্ক: বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
মালয়েশিয়া: বিনিয়োগ, ICT, ডিজিটাল অর্থনীতি, জ্বালানি, অবকাঠামো, হালাল শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন ও সেমিকন্ডাক্টরসহ বহুমুখী সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
কাতার: বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ রয়েছে।
কুয়েত: জনশক্তি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
পাকিস্তান: বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইরান: দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার হাত বাড়াতে ইরান বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়েছে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, জ্বালানি সহ বিভিন্ন খাতে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো আসে নি।
এখন আমাদের করণীয়
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দরজা খোলা একটি সুযোগ; কিন্তু সেই সুযোগকে জাতীয় সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করাই আসল কাজ।
১. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, সম্পদের সুরক্ষা, চুক্তির নিশ্চয়তা এবং পূর্বানুমানযোগ্য আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে।
দ্রুত অনুমোদন, One Stop Service, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ-গ্যাস, জমি ও ইউটিলিটি সুবিধা, স্বচ্ছ করব্যবস্থা এবং দ্রুত বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বন্দর ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করতে হবে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, Bay Terminal, Laldia Container Terminal, রেল, সড়ক ও বিমান যোগাযোগকে একটি সমন্বিত আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থায় আনতে হবে।
৪. ঢাকা ও চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের নগরীতে রূপ দিতে হবে।
রাস্তা, গণপরিবহন, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে হবে।
৫. পর্যটনকে বড় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাতে পরিণত করতে হবে।
কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট, বান্দরবান, রাঙামাটি, সুন্দরবনসহ পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রচারণার আওতায় আনতে হবে।
৬. তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে, সাড়ে চার কোটি তরুণের হাতকে কর্মীর হাতিয়ারে রূপান্তর করতে হবে।
AI, ICT, সফটওয়্যার, সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিকস, মেরিটাইম, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল ও আধুনিক কৃষিতে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করতে হবে।
৭. প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আধুনিক করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা গবেষণা, স্থানীয় উৎপাদন এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
“সবার আগে বাংলাদেশ”—শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব কর্মপরিকল্পনা– হিসাবে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই—যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারী বিমানবন্দরে নেমে নিরাপদ বোধ করবেন; বিনিয়োগ করতে অযথা হয়রানির শিকার হবেন না; তাঁর বিনিয়োগ আইনের সুরক্ষা পাবে এবং সেই বিনিয়োগ বাংলাদেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তির সুযোগ তৈরি করবে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই—যেখানে একজন পর্যটক কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট কিংবা পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও বিশ্বমানের সেবা পাবেন।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই—যেখানে আমাদের তরুণরা শুধু চাকরির সন্ধানে বিদেশে যাওয়ার চিন্তা করবে না; বরং দেশেই উদ্যোক্তা হবে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
আমাদের সামনে যে আন্তর্জাতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, তা কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের একার সম্পদ নয়—এটি বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ।
তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থে আমাদের লক্ষ্য এক হওয়া প্রয়োজন—
স্থিতিশীল বাংলাদেশ,
নিরাপদ বাংলাদেশ,
বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ,
প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ,
বিশ্বমানের বাংলাদেশ।
কূটনৈতিক সাফল্যকে অর্থনৈতিক সাফল্যে,
আন্তর্জাতিক আস্থাকে বিনিয়োগে,
বিনিয়োগকে কর্মসংস্থানে,
আর কর্মসংস্থানকে মানুষের সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হবে।
সুযোগ এসেছে। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
সারা বিশ্বের বিস্ময়—বাংলাদেশ।
এই বাংলাদেশই হোক আমাদের অহংকার।
করব কাজ, গড়ব দেশ
সবার আগে বাংলাদেশ ![]()
মোঃ লুৎফুল হাই ভূঁইয়া
প্রতিষ্ঠাতা, সভাপতি
তারেক রহমান সাইবার ফোরাম (TRCF)

